দি সকার ক্লাব
আমাদের মিল্কী মামাকে নিয়ে হয়েছে এক মহামুশকিল।
এমনি তো মিল্কী মামার সবই ভালো। সারাদিন টো-টো করে ঘুরছে, রাস্তায় অন্য পাড়ার ছেলেদের সাথে মারামারি করছে, সবাইকে নিয়ে হোটেল-রেস্তোরাঁয় খেয়ে নিজে সবার বিল দিচ্ছে। ফুটবল-হকি-ভলিবল নিয়ে খেলার মাঠে সকাল-বিকাল দৌড়াদৌড়ি করছে। সন্ধ্যায় ক্লাব ব্যাডমিন্টন-টেবিল টেনিস নিয়ে লাফালাফি করে রাত ন’টায় বাড়ি ফিরছে। এক কথায় দারুণ ফুর্তিবাজ, দুর্দান্ত ক্রীড়া-পাগল ছেলে।
কিন্তু মিল্কী মামার সামনে ক্রিকেট খেলার কথা উঠলে তো সেই মিল্কী মামা আর মিল্কী মামা নেই রেগে আগুন হয়ে তেলে বেগুনে জ্বলে, উঠবে যেন টেংরাটিলার গ্যাসক্ষেত্র। এদিকে মিল্কী মামা বাদে আমরা অন্য সবাই তো ক্রিকেট খেলার দারুণ ভক্ত। আর শুধু ভক্ত বললে কমই বলা হয়, বলতে হয় একেবারে ক্রিকেট পাগল। তাই ওই ক্রিকেট খেলা নিয়েই মিল্কী মামার সাথে আমাদের প্রায়ই প্রথমে মৃদু কথা কাটাকাটি পরে তর্জন-গর্জন, শেষে তো হাতাহাতিরই জো হয়।
ক্রিকেট খেলাটার উপর রেগে যাওয়ার বৈধ কারণ একটা অবশ্য মিল্কী মামার আছে। ছোটবেলায় ক্রিকেট খেলতে গিয়েই ওর উপরের পাটির একটা দাঁতের অর্ধেকটা ভেঙে গিয়েছিল। কথা বলার সময় ঠিক বোঝা যায় না। কিন্তু হাসলে কেমন যেন একটু বেখাপ্পা লাগে। তখন থেকেই ক্রিকেট খেলাটা ওর দুচক্ষের বিষ। সেই বিষ প্রথমে ছিল সাধারণ ধুতুরার বিষ, পরে বাড়তে বাড়তে হলো পোকা-মারার এনড্রিন আর এখন তো সেটা দুনিয়ার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষ পটাসিয়াম সায়নাইড ছুঁই ছুঁই করছে।
পাড়ার ক্লাবের বিকেলের আড্ডায় রবিন শুধু একদিন বলেছিল, ‘তুমি যা-ই বলো মামা, ক্রিকেট খেলার সাথে অন্য কোনো খেলার তুলনাই চলে না। পৃথিবীর সেরা খেলা ক্রিকেট। শুধু শুধু কি আর জ্ঞানী লোকেরা বলে গেছেন, খেলার রাজা ক্রিকেট আর রাজার খেলা ক্রিকেট’।
সাথে সাথে মিল্কী মামার চোখ দুটি রাগে লাল হয়ে উঠল। ব্যাঘ্র-গর্জনে বলল ‘ইহ্ জ্ঞানী লোক! কোন জ্ঞানী লোক। সক্রেটিস না রবীন্দ্রনাথ?’
মিল্কী মামার রাগ দেখে মনিও একটু রাগলো, গড়গড়ে গলায় বলল, ‘ওরা দুজন ছাড়াও অনেক জ্ঞানী লোক পৃথিবীতে আছে, তুমি তো কিছুই জানো না’।
মিল্কী মামা ডানহাতের বুড়ো আঙুলটা মনির মুখের কাছে নাড়াতে নাড়াতে বলল, ‘জানব না কেন, অবশ্যই জানি। তুই আছিস, রবিন আছে। আর পাবনার হেমায়েতপুরের পাগলা-গারদে গেলে তো ভুরি-ভুরি জ্ঞানীলোকের দেখা পাওয়া যায়।
মিল্কী মামা আর দাঁড়াল না। রাগে ফোঁস-ফোঁস করতে করতে ক্লাব ছেড়ে চলে গেল।
এ তো গেল একদিনের কথা। মিল্কী মামার ক্রিকেট-বিদ্বেষের কথা পুরোপুরি বললে তো ঢাউস একটা ইতিহাসই হয়ে যাবে।
একটু খুলেই বলি তা হলে।
বেশ কয়েক বছর আগের কথা। ওই তো যে-বার বাংলাদেশ আইসিসি চ্যাম্পিয়ানশিপে সবাইকে হারিয়ে দিয়ে চ্যাম্পিয়ান হয়ে বিশ্বকাপ-ক্রিকেট খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছিল। পুরো বাংলাদেশটাই তো ‘ক্রিকেট, ক্রিকেট’ করে পাগল হয়ে উঠেছিল। আর, হবেইবা না কেন। প্রথমে হল্যান্ডকে হারিয়ে দিয়ে সেমি-ফাইনালে তারা পর স্কটল্যান্ডকে গুঁড়িয়ে দিয়ে ফাইনালে, শেষে এক শ্বাসরুদ্ধকর লড়াই-এ কেনিয়াকে উড়িয়ে দিয়ে আইসিসি চ্যাম্পিয়ান।
বাংলাদেশে শুরু হলো উল্লাস আর নাচানাচি। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, সিলেট থেকে সুন্দরবন, শুধু আনন্দ আর আনন্দ, হইহই রইরই। স্কুল-কলেজ ছুটি, রং নিয়ে ছোটাছুটি, মানুষজন, ঘরবাড়ি, রঙে রঙে রঙিন। মিছিলে মিছিলে কাঁপছে রাজপথ। ঢাক-ঢোল ড্রাম-ঝাঁঝর তো বাজছেই সাথে বাজছে থালা-ঘটি-বাটি-চামচ এমনকি বালতিও।
সবচেয়ে মজার কথা, গম্ভীরমুখো বড়রা। যাদের মধ্যে আছেন আমাদের স্কুলের হেডমাস্টার স্যারও, যাকে ছেলেরা আড়ালে ওসামা বিন লাদেনের ছোটভাই বলে ডাকে, যারা লেখাপড়া ছাড়াও যে পৃথিবীতে আরও ভালো কাজ খাকতে পারে বিশ্বাসই করত না তারা পর্যন্ত বদলে গিয়েছিল। উল্লাসে ভাসছিল তারাও। পড়তে বসার জন্য কেউ আর রাম-ধমকও দিচ্ছিল না। দু-চারজন তো মিছিলের মধ্যে কয়েক পাক নেচেও
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments